সংস্কার – ড. এমদাদুল হক

অ্যামাদিউস মোজার্ট। ভাষা শেখার আগেই মাত্র ৩বছর বয়সে শিখে ফেলে ক্ল্যাভিয়ার বাজানো। ৫ বছর বয়সেই ভায়োলিনে অনন্য দক্ষতার পরিচয় দেন, ‘Sonata’ লিখেন মাত্র ৭ বছর বয়সে। কীভাবে?
গরিবের পুত্র সক্রেটিস। কুৎসিত। দুবেলা পেট ভরে খেতেই পায় না। অথচ তিনিই কিনা মানবজাতির আলোকবির্তকা! কীভাবে?
পিতৃহারা দুখু মিয়া জীবিকার জন্য রুটি পেষণ করেন। অথচ তিনিই কিনা বিস্ময়কর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্রষ্টা! কীভাবে?
সংস্কার।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, ‘সংস্কারের কত ক্ষমতা শোন- ধোপা যখন রাজার ছেলে হয়ে খেলা করছে, তখন সমবয়সীদের বলছে, ওসব খেলা থাক- আমি উপুড় হয়ে শুই, আর তোমরা আমার পিঠে হুসহুস করে কাপড় কাচ।’
বিজ্ঞানের ভাষায় যাহা ‘জিন’, ধর্মীয় পরিভাষায় তাহাই সংস্কার। পিতামাতার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, গুণাদি, রোগাদি সন্তান প্রাপ্ত হয় বটে, কিন্তু একই পিতামাতার সন্তানে একাধিক সন্তানে কত প্রভেদ- একজন কাপুরুষ তো অন্যজন মহাপুরুষ।
অশিক্ষিতি জনক-জননী থেকেও অসাধারণ গুণসম্পন্ন শিশুর জন্ম হয়। বিজ্ঞান বলে জিন আসে ঘুরে ঘুরে। ধর্ম বলে সংস্কার।
প্রতি বছর সাপের কামড়ে যত মানুষ মারা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায় বাসের চাপায়। তবু সাপ দেখলে আমরা আঁতকে উঠি, কিন্তু বাস দেখে আঁতকে উঠি না কেন?
সংস্কার।
আদিম মানুষ বনে-জঙ্গলে দীর্ঘদিন কাটানোর কারণে সর্পভয় সংস্কার হয়ে গেছে। বাসের ব্যাপারটি নতুন, তাই বাসভয় এখনো সংস্কার হয়ে উঠেনি।
যোগ্যতমের উদবর্তন তত্ত্বও প্রমাণ করে যে, টিকে থাকার যোগ্যতা বাহ্যজগৎ থেকে আসে না- আসে সংস্কার থেকে। মানবজাতি একই প্রজাতির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কেউ ধীর, কেউ ক্ষিপ্র, কেউ বাচাল, কেউ শান্ত, কেউ অস্থির। সংস্কার ব্যতীত এত প্রকরণ কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না।
সংস্কার হলো অভুক্ত কর্মফল। মানুষ তার কর্মফল ভোগ করতে বাধ্য। কর্মফল ভোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ মুক্তি পেতে পারে না।
মানবশিশু জন্ম নেয় কিছু জন্মগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে। জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলো হলো জন্মগত সংস্কার। এই সংস্কারগুলোর ছাপ পরিণত বয়সেও থেকে যায়।
প্রবাহমান জীবনে ঐচ্ছিক কর্ম ও অভ্যাসের যেসব সংস্কার গড়ে উঠে তা অর্জিত সংস্কার।
জাতি, ধর্ম, দেশ, পরিবেশ যেসব সংস্কার আরোপ করে তা হলো আরোপিত সংস্কার। শিক্ষা মানুষের আচরণে কিছু পরিবর্তন আনতে পারে বটে, কিন্তু আরোপিত সংস্কারগুলো সহজে ভাঙতে পারে না। তাই একই ধরনের জাতি, ধর্ম, দেশ, পরিবেশে জীবনধারা চলতে থাকে।
সাধারাণত জীবনধারা প্রবাহিত হয় জলধারার মতোই। জলধারা খুঁজে গহ্বর। জীবনধারা খুঁজে জঠর। কাছাকাছি জঠর না পাওয়া গেলেই দূরে যায়।
কে বাহিত হয়? কে জন্ম নেয়? যে জীবিত আছে, তারই মৃত্যু হয়। যার মৃত্যু হয়, তারই জন্ম হয়। সে কে?
আমি ও আমার। যে এখন লিখছে, তার। যে এখন পড়ছে তার। কে সে?
আমার কিছু স্মৃতি, কিছু গুণ, কিছু অসমাপ্ত কাজ- যা সমাপ্ত করা যায়নি নানাবিধ বাধায়। এই অসমাপ্ত, অপূর্ণ সংবিৎকেই তো আমরা সংক্ষেপে বলি, অহং। আমার স্বপ্ন, আমার আশা, আমার রাগ, আমার বাসনা, আমার আসক্তি এই তো আমি। এই তো প্রবাহিত হয় জীবন থেকে জীবনে পূর্ণতার অভিলাষে।
যখন কিছু একটা হওয়ার বাসনা থাকে না, কিছু একটা করার অতৃপ্তি থাকে না তখনই আসে পূর্ণতার উপলব্ধি, অমরত্বের স্বাদ।
পুনর্জন্মে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস থেকে কিছু পাওয়া যায় না। তাই এ নিয়ে বিতর্ক সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। যারা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে তারা সবাই স্বর্গে চলে যায়নি। যারা অবিশ্বাস করে তারাও নরকবাসী হয়নি। বিশ্বাস মানুষকে বদলায় না। শোনাকথায় বিশ্বাস মৃত।
পুনর্জ্জন্ম কিংবা পুনরুত্থান ধর্মের সারকথাও নয়। ধর্মের সার হলো কর্ম ও কর্মফল। ধর্মকে পুনর্জ্জন্ম ও পুনরুত্থান হতে বিযুক্ত করা যায় কিন্তু কর্ম থেকে বিযুক্ত করা যায় না। আজকের কর্মফল যেমন আগামীকাল পাওয়া যায় তেমনি এ জন্মের কর্মফল পাওয়া যাবে পরবর্তী জন্মে। যে পরজন্মে বিশ্বাস করে না, তার ক্ষেত্রেও কর্মফল ভিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। যে পরজন্মে বিশ্বাস করে তারও বোনাস পাওয়ার সুযোগ নেই।
পরকাল যে মানে না, সেও যদি সৎকর্ম করে, তবে শুধু বিশ্বাস না করার কারণে শাস্তি লাভের যুক্তি নেই।
‘এ জীবনে যখন হলো না, পরবর্তী জীবনে হবে’- এমন অলীক কল্পনা যে করে, পরবর্তী জীবনেও তার হবে না। কারণ, এটিই হয়ে যাবে তার মূল সংষ্কার। রূপান্তর কেবল তার পক্ষেই সম্ভব, যে এখনই রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এক জীবনে যে বারবার জন্ম-মৃত্যুর মৃত্যুর স্বাদ নিতে পারে সে-ই মুক্ত হয়ে যায় হওয়া না হওয়ার দ্বৈরথ থেকে। বাকিদের সামনে মূলা ঝুলে, যে মূলার নাগাল তারা কখনো পায় না।

(Visited 5 times, 1 visits today)

Related Post

Backup full wordpress site with updraft plus plugi... https://www.youtube.com/watch?v=AJI-ZMD7qWE
ন্যায় – ড. এমদাদুল হক... আইন অমান্য করা অপরাধ। অপরাধের বিচার হয় আইনানুযায়ী। বিচারক ঘটনা দেখে না- দেখে প্রমাণ ও যুক্তি। তাই হত্যাকারীও আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়, আবার নিরপরাধ...
How to earn money online in bangladesh Earn money online in bangladesh in many ways. In this post, i will describe all about the ways as far possible. Before starting to earn money online, ...
নিয়তি – ড. এমদাদুল হক... জীবনের অনেক অব্যাখ্যাত ঘটনা মানুষকে নিয়তির উপর বিশ্বাসী করে তুলে। জীবন চলার পথে প্রায় প্রত্যেকেই এটি উপলব্ধি করতে পারে যে, এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যা মানু...
আজ রাতে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা আর ইরাক... মেসিকে ছাড়াই আজ ইরাকের বিপক্ষে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা দল। এই ম্যাচের আগেই শোনা যাচ্ছে একাদশে প্রথম থেকেই থাকবেন দিবালা। তবে একাদশ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।...
মাছে-ফলে-সবজিতে বিষ – মোনেম অপু... মাছ ও ফল সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহার চলে আসছে কত বছর হলো! রুই-কাতলা, আম-কলা, সবজি, দুধ কিছুই রেহায় পাচ্ছে না। ফরমালিন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ক...
Free ad posting sites in bangladesh Free ad posting sites in Bangladesh, on this post you will get some most popular free ad posting sites in Bangladesh. On these site you can post your ...
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার পাঁচ খাবার ডেকে আনছে মরণ র... প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় চোখ রাখলে অনেক সময়েই আঁতকে উঠতে হয়, বিশেষ করে যখন জানা যায় এই খাদ্যতালিকার বেশ কয়েকটি খাবারই আমাদের শরীরে মারণ রোগ ক্যানসারকে ...
এবার মাঠে নামছেন আশরাফুল... এবার মাঠে নামছেন আশরাফুল। সোমবার থেকে জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) ২০তম আসরের দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু হচ্ছে। চারটি ম্যাচ মাঠে গড়াবে একই দিনে। মুখোমুখি হবে...
Earn money with coinbase Coinbase is the most popular cryptocurrency wallet in the world. This is the best and most secure way to get and pay Bitcoin or other currency. But th...

Leave a Reply